
রক্তের উপাদান ও এদের কাজ
রক্তের প্রধান উপাদানগুলো হলো রক্তরস বা প্লাজমা এবং রক্তকণিকা। সমগ্র রক্তের ৫৫% রক্তরস এবং বাকি ৪৫% রক্তকণিকা রক্তরসকে আলাদা করলে এটি হলুদ বর্ণের দেখায় এবং রক্তকণিকাগুলো এই রক্তরসে ভাসমান থাকে।
রক্তরস বা প্লাজমা
রক্তের তরল অংশ কে প্লাজমা বলে।
রক্তরসের প্রায় ৯০% পানি, বাকি ১০% দ্রবীভূত অবস্থায় থাকে বিভিন্ন রকমের জৈব এবং অজৈব পদার্থ।
অজৈব পদার্থগুলোর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরণের খনিজ পদার্থের আয়ন, যেমন :- সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ক্লোরিন, ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস, লৌহ, আয়োডিন এবং O2 , CO2 , এবং N2 জাতীয় গ্যাসীয় পদার্থ। জৈব পদার্থগুলো হলো :-
১. খাদ্যসার : গ্লুকোজ, অ্যামিনো এসিড, স্নেহপদার্থ, ভিটামিন ইত্যাদি।
২. রেচন পদার্থ : ইউরিয়া, ইউরিক এসিড, ক্রিয়েটিনিন ইত্যাদি।
৩. প্রোটিন : ফাইব্রিনোজেন, এলবুমিন ইত্যাদি।
৪. প্রতিরক্ষামূলক দ্রব্যাদি : এন্টিটক্সিন, এগ্লুটিনিন ইত্যাদি।
৫. অন্তঃক্ষরা গ্রন্থির বিভিন্ন হরমোন।
রক্তরসের কাজগুলো হচ্ছে
১. রক্তকণিকাসহ রক্তরসে দ্রবীভূত খাদ্যসার দেহের বিভিন্ন অংশে বাহিত করা।
২. টিস্যু থেকে বর্জ্য পদার্থ নির্গত করে, সেগুলো রেচনের জন্য বৃক্কে পরিবহন করা।
৩. শোষণের ফলে কোষের সৃষ্ট
CO2 কে বাইকার্বোনেট হিসেবে ফুসফুসে পরিবহন করা।
৪. রক্ত জমাট বাঁধার প্রয়োজনীয় উপাদানগুলো পরিবহন করা।
৫. হরমোন, এনজাইম, লিপিড দেহের বিভিন্ন অংশে বহন করা।
সিরাম
রক্ত থেকে রক্তকণিকা এবং রক্ত জমাট বাঁধার জন্য যে প্রয়োজনীয় প্রোটিন আছে, সেটাকে সরিয়ে নেওয়ার পর যে তরলটি রয়ে যায়, তাকে সিরাম বলে।
অন্যভাবে বলা যায়, রক্ত জমাট বাঁধার পর যে হালকা হলুদ রঙের স্বচ্ছ রস পাওয়া যায় তাকে সিরাম বলে। রক্তরস বা প্লাজমা এবং সিরামের মাঝে পার্থক্য হলো রক্ত রসে রক্ত জমাট বাঁধার প্রয়োজনীয় প্রোটিন থাকে, সিরামে সেটি থাকে না।
রক্তকণিকা
রক্তরসের মধ্যে ছড়ানো বিভিন্ন রকমের কোষকে রক্ত কণিকা বলে। রক্তকণিকা গুলো প্রধানত তিন রকমের যথা :-
*লোহিত রক্তকণিকা বা এরিথ্রোসাইট
*শ্বেত রক্তকণিকা বা লিউকোসাইট
*অণুচক্রিকা বা থ্রম্বোসাইট।
লোহিত রক্তকণিকা
মানবদেহে পরিণত লোহিত রক্তকণিকা দ্বি-অবতল এবং চাকতি আকৃতির। এতে হিমোগ্লোবিন নাম রঞ্জক পদার্থ থাকার কারণে দেখতে লাল বর্ণের হয়। এজন্য এদেরকে Red Blood Cell বা RBC বলে। অন্যভাবে বলা যায়, লোহিত কণিকা প্রকৃত পক্ষে হিমোগ্লোবিন ভর্তি চ্যাপ্টা আকৃতির ভাসমান ব্যাগ। একারণে লোহিত কণিকা অধিক পরিমান অক্সিজেন বহন করতে পারে। লোহিত কণিকাগুলো বিভাজন হয় না। এ কণিকা গুলো সর্বক্ষণই অস্থিমজ্জার ভিতরে উৎপন্ন হতে থাকে এবং উৎপন্ন হওয়ার পর রক্ত রসে চলে আসে। মানুষের লোহিত কণিকার আয়ু প্রায় চার মাস অর্থাৎ ১২০ দিন। স্তন্যপায়ী প্রাণীদের লোহিত রক্ত কণিকা গুলো উৎপন্ন হওয়ার পর রক্ত রসে আসার পূর্বে নিউক্লিয়াসবিহীন হয়ে যায়। অন্যান্য মেরুদন্ডী প্রাণীর ক্ষেত্রে এরকম ঘটে না অর্থাৎ এদের লোহিত কণিকা গুলোতে নিউক্লিয়াস থাকে। লোহিত কণিকা প্লীহা(Spleen)
তে সঞ্চিত থাকে এবং তাৎক্ষণিক প্রয়োজনে প্লীহা থেকে লোহিত কণিকা রক্ত রসে সরবরাহ করে।
বিভিন্ন বয়সের মানবদেহে প্রতি ঘন মিলিমিটার রক্তে গড়ে লোহিত কণিকার সংখ্যা ভিন্ন যেমন :- ভ্রূণ দেহে : ৮০-৯০ লাখ; শিশুর দেহে : ৬০-৭০ লাখ; পূর্ণবয়স্ক পুরুষ দেহে : ৪.৫-৫.৫ লাখ; এবং পূর্ণবয়স্ক নারীর দেহে : ৪.০-৫.০ লাখ।
লোহিত কণিকার কাজ
লোহিত রক্তকণিকার প্রধান কাজ হলো :-
১. দেহের প্রতিটি কোষে অক্সিজেন সরবরাহ করা।
২. নিষ্কাশনের জন্য কিছু পরিমান কার্বন ডাই-অক্সাইডকে টিস্যু থেকে ফুসফুসে বহন করা।
৩. হিমোগ্লোবিনের সাহায্যে রক্তের অম্ল-ক্ষারের সমতা বজায় রাখার জন্য বাফার হিসেবে কাজ করা।
শ্বেত রক্তকণিকা বা লিউকোসাইট
শ্বেত রক্তকণিকার নির্দিষ্ট কোনো আকার নেই। এগুলো হিমোগ্লোবিনবিহীন এবং নিউক্লিয়াসযুক্ত বড় আকারের কোষ। শ্বেত রক্তকণিকার গড় আয়ু ১-১৫ দিন। হিমোগ্লোবিন না থাকার কারণে এদের শ্বেত রক্তকণিকা, ইংরেজিতে
White Blood Cell বা WBC বলে। শ্বেত রক্তকণিকার সংখ্যা লোহিত রক্ত কণিকার তুলনায় অনেক কম। এরা এমিবার মতো দেহের আকারের পরিবর্তন করে। ফ্যাগোসাইটোসিস পক্রিয়ায় এটি জীবাণুকে ধ্বংস করে। শ্বেত রক্তকণিকা গুলো রক্ত রসের মধ্যে দিয়ে নিজেরাই চলতে পারে। রক্ত জালিকার প্রাচীর ভেদ করে টিস্যুর মধ্যে প্রবেশ করতে পারে। দেহ বাইরের জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হলে দ্রুত শ্বেত রক্তকণিকার সংখ্যা বৃদ্ধি ঘটে। মানবদেহে প্রতি ঘন মিলিমিটার রক্তে ৪-১০ হাজার শ্বেত রক্তকণিকা থাকে।
অসুস্থ মানবদেহে এর সংখ্যা বেড়ে যায়। শ্বেত রক্তকণিকায়
DNA
থাকে।
অণুচক্রিকা বা থ্রম্বোসাইট
ইংরেজিতে এদের কে প্লেইটলেট (Platelet) বলে। এগুলো গোলাকার, ডিম্বাকার, অথবা রড আকারের হতে পারে এদের সাইটোপ্লাজম দানাদার এবং সাইটোপ্লাজমে কোষ অঙ্গাণু - মাইটোকন্ড্রিয়া, গলগি বস্তু থাকে; কিন্তু নিউক্লিয়াস থাকে না।
অনেকের মোতে, অণুচক্রিকা গুলো সম্পূর্ণ
কোষ নয়; এগুলো অস্থিমজ্জার বৃহদাকার কোষের ছিন্ন অংশ।
অণুচক্রিকা গুলোর গড় আয়ু ৫-১০ দিন।
পরিণত মানবদেহে প্রতি ঘন মিলিমিটার রক্তে অণুচক্রিকার সংখ্যা প্রায় আড়াই লাখ। অসুস্থ দেহে এদের সংখ্যা আরো বেশি হয়।
অণুচক্রিকার প্রধান কাজ হলো রক্ত তঞ্চন করা বা জমাট বাঁধনকে সাহায্য করা।
No comments:
Post a Comment